পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুত না। এটা সঙ্কটে থাকা অর্থনীতিতে ধাক্কা
-তৌফিক উদ্দিন আহমেদ
কারফিউর কারণে সৈকতের কোথাও কোনো পর্যটকদের আনাগোনা নেই
- হোসাইন আমির
বিপর্যস্ত কক্সবাজারের পর্যটন খাত। অনেক শ্রমিক তাদের চাকরি হারাবে
- আবুল কাশেম সিকদার
ক্ষতির পরিমাণ এখনই নয় মাস শেষে ধারণা পাওয়া যাবে
-আলোক বিকাশ চাকমা
আতাউর রহমান জুয়েল
আন্দোলন, নাশকতা আর কারফিউয়ের প্রভাব পড়েছে পর্যটন শিল্পে। পর্যটকশূন্য দেশের বিনোদন কেন্দ্রগুলো। ভ্রমণ পিপাসুদের প্রথম পছন্দ কক্সবাজার সৈকতের কোথাও নেই কোনো পর্যটকের আনাগোনা। বান্দরবান, রাঙ্গামাটি, খাগড়াছড়ির বিভিন্ন স্পটেও পড়ছে না কোনো ভ্রমণবিলাসীর পদচিহ্ন। সমুদ্রসৈকত কুয়াকাটায় খালি পড়ে আছে পাতা বেঞ্চিগুলো। বুকিং নেই হোটেল-মোটেলগুলোতে। একই অবস্থা দেখা যায় সিলেটের জাফলং, মাধবকুণ্ড, শ্রীমঙ্গলসহ বিভিন্ন পর্যটন কেন্দ্রগুলোতে। এতে বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়েছে রিসোর্টের মালিক, হোটেল-মোটেল, পরিবহন, কুটিরশিল্প ও খাবার ব্যবসায়ীরা। শুধু তই নয় বড় ধাক্কা খাবে দেশের জাতীয় অর্থনীতি। গত ১ জুলাই থেকে শুরু হওয়া কোটাবিরোধী আন্দোলনে অচল হয়ে পড়ে সারা দেশ। এর পর গত ১৯ জুলাই রাত থেকে কারফিউ জারি করে সরকার। রাস্তায় নামে সেনাবাহিনী। ছাত্রদের দাবি মেনে নেয়ায় ও কারফিউ কিছুটা শিথিল হলেও আতঙ্ক কাটেনি সাধারণ মানুষের। দর্শনীয় স্থানে আগ্রহ ফেরেনি ভ্রমণ পিয়াসীদের।
এদিকে দেশের বর্তমান পরিস্থিতিতে গত সপ্তাহে বেশকিছু পর্যটন স্পটের পূর্ব নির্ধারিত ট্রিপ বাতিল করা হয়। এ বিষয়ে ট্যুর অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের সাবেক সভাপতি তৌফিক উদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘এমন পরিস্থিতির জন্য ট্যুর অপারেটর বা পর্যটক কেউই প্রস্তুত ছিলেন না। এটা সঙ্কটে থাকা অর্থনীতিতে বড় ধাক্কা।’
পর্যটকশূন্য কুয়াকাটা
পর্যটকশূন্য কুয়াকাটা। সৈকতের কোথাও নেই কোনো পর্যটকদের আনাগোনা। খালি পড়ে আছে পাতা বেঞ্চিগুলো। বুকিং নেই হোটেল-মোটেলগুলোতে। সারা দেশে কারফিউ জারি হওয়ার পর থেকে এমন অবস্থা বিরাজ করছে। এর ফলে পর্যটননির্ভর ব্যবসায়ীদের মধ্যে বিরাজ করছে হতাশা। পর্যটক না থাকায় অলস সময় পার করছেন হোটেল কর্মচারীরা। এদিকে কারফিউ শিথিল করায় স্বাভাবিক হতে শুরু করেছে জীবনযাত্রা। সকাল থেকে খুলেছে দোকানপাট। স্থানীয় বাজারগুলোতে মানুষের আনাগোনা বাড়তে শুরু করেছে। তবে যেকোনো অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে মাঠে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সদস্যদের লক্ষ্য করা গেছে।
পর্যটক সংশ্লিষ্টরা জানান, কারফিউর কারণে পর্যটকদের আনাগোনা নেই। তাই অলস সময় কাটাচ্ছে অনেকে। হোটেল-মেটেলেগুলোর সব রুমই ফাঁকা। কবে নাগাদ আবার পর্যটক আসবে সেটা বলতে পারেনি তারা। তবে লোকসানের মুখে পড়েছে পর্যটন সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা। কুয়াকাটা ট্যুরিজম ম্যানেজমেন্ট অ্যাসোসিয়েশন কুটুম’র সাধারণ সম্পাদক হোসাইন আমির বলেন, কারফিউর কারণে সৈকতের কোথাও কোনো পর্যটকদের আনাগোনা নেই। তবে কিছু স্থানীয় লোকজন সৈকতের অবস্থা দেখতে বেরিয়েছে। ট্যুরিস্ট পুলিশ কুয়াকাটা রিজিয়নের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আবুল কালাম আজাদ সাংবাদিকদের জানান, যে কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে ট্যুরিস্ট পুলিশসহ অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনী মাঠে কাজ করছে।
কক্সবাজারে দেড়শ কোটি টাকার ক্ষতি
এদিকে পর্যটকশূন্য বিশ্বের দীর্ঘতম সমুদ্রসৈকত কক্সবাজার। ফলে পর্যটন ব্যবসায়ীরা হতাশ হয়ে পড়েছেন। এর প্রভাবে পর্যটন সংশ্লিষ্ট প্রায় ২০ হাজার শ্রমিক বেকার হওয়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে।
কক্সবাজারের পর্যটন খাতে প্রায় ১৫০ কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে এমন দাবি করেন পর্যটন ব্যবসায়ীরা।
সাড়ে ৪শ হোটেলে ও গেস্ট হাউসে এ পর্যন্ত ১০০ কোটি টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। পাশাপাশি রেস্তোরাঁ ও অন্যান্য খাতে ক্ষতি হয়েছে ৫০ কোটি টাকা।
সৈকতের লাবণী পয়েন্টে দেখা যায়, হোটেলগুলোতে ঝুলছে তালা। চারদিকে সুনসান নীরবতা। অলস সময় পার করছেন সৈকতের ফটোগ্রাফার, বিচ বাইক-ওয়াটার বাইক চালক ও ঘোড়াওয়ালারা। বালিয়াড়িতে খালি পড়ে থাকতে দেখা যায় কিটকটগুলো।
কক্সবাজার জেলা প্রশাসনের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট আতাউল গনি ওসমানী বলেন, কক্সবাজার এই মুহূর্তে তেমন পর্যটক নেই। যারা কক্সবাজার ভ্রমণে এসে আটকা পড়েছিল তাদের সেনাবাহিনীর পাহারায় পৌঁছে দেয়া হয়েছে। বর্তমানে কক্সবাজার নিরাপত্তার চাদরে ঢাকা।
কলাতলী মেরিন ড্রাইভ হোটেল-মোটেল মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মুকিম খান জনান, প্রতিদিন লোকসান হচ্ছে কোটি টাকা। এই মুহূর্তে কক্সবাজারে পর্যটক নেই। যা ছিল সেনাবাহিনীর পাহারায় ৭১টি বাসে করে ফিরে গেছে। দেশের পরিবেশ পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হলে প্রায় সব হোটেল-মোটেল বন্ধ হয়ে যাবে। এতে বিরাট ক্ষতির মুখে পড়ব আমরা।
কক্সবাজার হোটেল-মোটেল ও গেস্টহাউস মালিক সমিতির সভাপতি আবুল কাশেম সিকদার জানান, চলমান কারফিউ ও বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে অস্থিরতায় কারণে বিপর্যস্ত কক্সবাজারের পর্যটন খাত। এ অবস্থা চলতে থাকলে এ খাতের সাথে যুক্ত অনেক শ্রমিক তাদের চাকরি হারাতে পারে।
থমকে গেছে পাহাড়ের পর্যটন শিল্প
রাঙ্গামাটির সাজেক ভ্যালিসহ তিন পার্বত্য জেলার ছোট-বড় পর্যটন কেন্দ্রগুলোর সবই এখন পর্যটকশূন্য। দেশের চলমান পরিস্থিতির প্রভাব রয়েছে পর্যটন শিল্পে বলে মনে করেন রাঙ্গামাটির রিসোর্ট মালিকরা। চলমান পরিস্থিতিতে পর্যটক-খরায় ভুগছে বিনোদন স্পটগুলো।
উদ্যোক্তারা বলছেন, পরিস্থিতি স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরলে পাহাড়ের পর্যটন খাত ঘুরে দাঁড়াতে পারবে। রাঙ্গামাটির পাশাপাশি অন্য দুই পার্বত্য জেলার পর্যটন খাতের অবস্থাও একই বলে জানিয়েছেন ।
সাজেক কটেজ মালিক সমিতির সহকারী সাধারণ সম্পাদক মতিজয় ত্রিপুরা জানান, সাজেক ভ্যালি পর্যটকশূন্য আন্দোলনের পর থেকেই। এখানে ব্যবসার পরিস্থিতি খুবই খারাপ। রিসোর্ট ও কটেজগুলোতেও দু-একজন ছাড়া কর্মীর উপস্থিতি নেই। এ এলাকার ব্যবসায়ীরা দোকানপাট বন্ধ রেখে বাড়িতে চলে গেছেন। রাঙ্গামাটির অন্য হোটেল-মোটেল ও রিসোর্টগুলোয়ও একই চিত্র দেখা যায়।
রাঙ্গামাটি জেলা আবাসিক হোটেল-মোটেল বহুমুখী সমবায় সমিতির সাধারণ সম্পাদক মো. মঈন উদ্দীন বলেন, ‘সারা দেশে উদ্ভূত পরিস্থিতির কারণে পর্যটন খাত থমকে গেছে। বড় ধরনের ধাক্কা খাবে দেশের পর্যটন খাত।’
জেলা পর্যটন করপোরেশনের ব্যবস্থাপক আলোক বিকাশ চাকমা বলেন, আন্দোলন ও কারফিউয়ের কারণে গত কয়েকদিনে ক্ষতির পরিমাণ এখনই ধারণা করা যাচ্ছে না। মাস শেষে হিসাব করলে এ বিষয়ে ধারণা পাওয়া যাবে।’
রাঙ্গামাটির ট্যুরিস্ট বোট মালিক সমিতির সহসভাপতি ও পর্যটন বোট ঘাটের ব্যবস্থাপক রমজান আলী বলেন, ‘পর্যটকের অভাবে সবকিছু বন্ধ। বোটচালকরাও অলস সময় কাটাচ্ছেন। অনেকে বাড়ি চলে গেছেন।’
দুরবস্থায় সিলেটের বিনোদন কেন্দ্রগুলো
চরম দুরবস্থা বিরাজ করছে সিলেটের বিনোদন কেন্দ্রগুলোয়। গত মে মাস থেকে তিন দফা বন্যা। বন্যার ক্ষত কাটার আগেই কোটাবিরোধী আন্দোলন ও কারফিউয়ে দেশজুড়ে অচলাবস্থা চলছে।
পর্যটন-সংশ্লিষ্টরা জানান, এই ভরা মৌসুমে সিলেট বিভাগে পর্যটন খাতে ক্ষতি হয়েছে ৫০০ কোটি টাকার বেশি। চলমান কারফিউ পরিস্থিতিতে মাস শেষে বিদ্যুৎ বিল ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন দিতে হিমশিম খাচ্ছে হোটেল-মোটেলগুলো।
পর্যটন খাত ঘিরে সিলেটে গড়ে উঠেছে কয়েকশ রিসোর্ট, হোটেল-মোটেল, গেস্টহাউস । কিন্তু গত মে মাস থেকে তিন দফা বন্যায় বারবার বন্ধ ঘোষণা করা হয় পর্যটন কেন্দ্রগুলো। নদীতে পানি ও স্রোত বৃদ্ধি এবং প্রশাসনের নিষেধাজ্ঞার কারণে পর্যটকরা সিলেট থেকে মুখ ফিরিয়ে নেন। বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি ও নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার হওয়ায় চলতি মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহ থেকে সিলেটে পর্যটকরা আসতে শুরু করেন। ফের ঘুরে দাঁড়ানোর স্বপ্ন দেখা শুরু করেন পর্যটন খাতের ব্যবসায়ীরা। কিন্তু সেই স্বপ্ন মিলিয়ে যায় কোটাবিরোধী আন্দোলনে। দেশজুড়ে কোটা সংস্কার আন্দোলন এবং পরবর্তীতে সংঘাত-সংঘর্ষ ও কারফিউর কারণে পর্যটন খাতের ব্যবসায় ধস নামে।
সিলেটের কয়েকজন হোটেল ব্যবসায়ী জানান, বর্ষা মৌসুমে সারা দেশে পর্যটন ব্যবসা কমলেও সিলেটে পর্যটক আগমন হয় সবচেয়ে বেশি। কিন্তু এবার বন্যা ও কোটা আন্দোলনে পর্যটকদের দেখা মেলেনি সিলেটে। এমনকি বন্যার কারণে ঈদুল আজহায়ও সিলেটের পর্যটন কেন্দ্রগুলো বন্ধ ছিল। ফলে গত তিন মাস ধরে সিলেটের বেশিরভাগ হোটেল পর্যটকশূন্য রয়েছে।
সিলেটের টাঙ্গুয়ার হাওরে হাউসবোট সার্ভিস পরিচালনাকারী ট্যুর গ্রুপ বিডির মালিক ইমরানুল আলম বলেন, জুলাই থেকে আগস্ট এ অঞ্চলের পর্যটনের পিক সিজন। টাঙ্গুয়ার হাওরের পাশাপাশি শ্রীমঙ্গলের চা বাগান ও জাফলংয়ের জলপ্রপাতে এ সময় থাকে দর্শনার্থীর উপচেপড়া ভিড়। তবে বেশিরভাগ বুকিং বাতিল হয়ে গেছে, তাই এক সপ্তাহের বেশি সময় ধরে কোনো পর্যটক এই স্পটগুলোতে আসেনি।
তিনি আরও জানান, টাঙ্গুয়ার হাওরে অন্তত ২০০ হাউসবোট রয়েছে, যার মধ্যে প্রায় ৮০ শতাংশ বর্ষা মৌসুমে বুকিং থাকে। কিন্তু সব হাউসবোট আপাতত অলস বসে আছে ।
তিনি বলেন, আকার ও সুযোগ-সুবিধার ওপর নির্ভর করে একটি হাউসবোট প্রতি সপ্তাহে তিন লাখ থেকে পাঁচ লাখ টাকা আয় করে। হাউসবোট অপারেটরসহ অন্যান্য সেবা সরবরাহকারীরা কমপক্ষে ২ কোটি টাকা রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হবে। এই অচলাবস্থার দ্রুত অবসান চান তিনি।
নিউজটি আপডেট করেছেন : Dainik Janata
